নড়াইলে ৬৪ প্রহর মহানামযজ্ঞানুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে সেষ হলো আধ্যাতিক সাধক শ্রী শ্রী বাবা নিশিনাথের মাষ ব্যাপী মেলা!!!

3

নড়াইল জেলা প্রতিনিধি ॥ নড়াইলে ৬৪ প্রহর মহানামযজ্ঞানুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে সেষ হলো আধ্যাতিক সাধক শ্রী শ্রী বাবা নিশিনাথের মাষ ব্যাপী মেলা সেই বিশ্বাস থেকেই প্রায় দু’শত বছর যাবৎ হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা বৈশাখ মাসের প্রতি শনি ও মঙ্গলবার পাকড়কাছটিকে তারা পূজা-অর্চনা করে আসছেন।
জানা গেছে, নড়াইল-গোবরা-নওয়াপাড়া সড়কের পাশে কুড়িগ্রামে অবস্থিত শ্রী শ্রী বাবা নিশিনাথ তলার মন্দির। এখানে রয়েছে বিশাল এক পাকড়গাছ যা দেখতে অনেকটা বটগাছের মত। কত বছর পূর্বে এ মন্দিরটি অবস্থিত তার সঠিক ইতিহাস কেউ বলতে পারে নি।
কারো মতে দেড়’শ বছর, কারো মতে দু’শ বছর, কারো মতে তারও বেশি হতে পারে। বছরের সব সময় এখানে পূজা-অর্চনা হলেও বিশেষ করে বৈশাখ মাসের প্রতি শনি ও মঙ্গলবার এখানে সকাল থেকেই দেশের বিভিন্ন জেলাসহ দেশের বাইরে থেকেও ভক্তরা আসেন পূজা দিতে।
নিশিনাথতলা মন্দিরের পাশেই রয়েছে চিত্রানদী সেখান থেকে পানি এনে পাকড়কাছটিতে ঢেলে, তৈল, ফুল, দুধ দিয়ে পূজা-অর্চনা করে থাকেন বাবা নিশিনাথের ভক্তরা। তাদের ধারনা মতে মনের বাসনা পূরণ করতে গাছের ডালে ইট বেধে রেখে যান, মনের বাসনা পূরণ হলে পুনরায় এসে পূজা করে ইট খুলে রেখে যান।
শ্রী শ্রী বাবা নিশিনাথে মন্দির নিয়ে রয়েছে নানান মত। কারো মতে প্রায় দু’শ বছর পূর্বে বাবা নিশিনাথ নামে এক মহা মনীষী এখানে এসে আস্তানা তৈরি করেন। বাবা নিশিনাথের কাছে যেয়ে তাদের বিভিন্ন সমস্যার কথা বললে বা রোগব্যাধী হলে তা থেকে মুক্তি পেতে থাকে। এভাবেই ধীরে ধীরে প্রচার হতে থাকে আর ভক্তদের বেশি বেশি আগমন হতে থাকে আর পূজা-অর্চনা শুরু করে।
তবে যশোর এবং নড়াইলের ইতিহাস বই সূত্রে জানা গেছে, অতীতে নিশিনাথ নামের এক ডাকাত সরদার তার দলবল নিয়ে এখানকার গভীর বনে আশ্রয় নিয়ে নদীপথে যাতায়াতকারী পণ্যবাহী যানে ডাকাতি করতেন। বাগানের একটি পাকড়গাছের নিচেই ছিল তার আস্তানা। চিত্রার পাড় দিয়ে ছিল পায়ে চলার পথ।
একদিন এক বৃদ্ধা এই পথ দিয়ে হেঁটে তার মেয়ের বাড়ি যাচ্ছিলেন। ঘটনাস্থলে পৌঁছেই ডাকাত নিশিনাথের কথা মনে পড়ে গেলে ফেরার পথে তার উদ্দেশ্যে পূজা-অর্চনা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে নিরাপদে তিনি যেতে সম হন। ফেরার পথে ওই বৃদ্ধা যথারীতি নিশিনাথের উদ্দেশ্যে পূজা-অর্চনা দেন। এ খবর নিশিনাথের কানে পৌঁছায়।
ওই বৃদ্ধার নিরাপদে বাড়ি ফেরার বিষয়টি সবাইকে অবাক করে। এরপর থেকে এই পথে যাতায়াতকারী ব্যক্তিরা নিশিনাথের নামে পূজা-অর্চনা দিতে থাকেন এবং নিরাপদে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে থাকেন। মানুষের পূজা-অর্চনা পেয়ে ডাকাত নিশিনাথের মধ্যে পরিবর্তন আসতে থাকে। একপর্যায়ে নিশিনাথ পাপের অনুশোচনা নিয়ে ডাকাতি ছেড়ে দেন।
প্রতিদিন ভোরে চিত্রা নদীতে স্নান করে ওই পাকড়গাছের তলায় ঈশ্বরের আরাধনায় মগ্ন হয়ে তিনি সিদ্ধি লাভ করেন এবং গাছতলাতেই দেহত্যাগ করেন। পরে সেখানে নির্মিত হয় একটি ছোট মন্দির। আর সেই থেকে এ স্থানের নাম হয় শ্রী শ্রী নিশিনাথতলা মন্দির।
পূজা দিতে আসা মালতি বিশ্বাস বলেন, ছোট্ট বেলা থেকেই বাবা নিশিনাথে পূজা করে আসছি মায়ের সাথে এসে। আজও আসছি আমার সন্তানদের নিয়ে। বাবা নিশিনাথ ঠাকুরের সন্তুষ্টি লাভের মাধ্যমে পাপ মোচনের উদ্দেশ্যে পূজা দেওয়া।
কলেজছাত্রী সুস্মিতা দাস বলেন, বাবা-মায়ের কাছে শুনেছি বাবা নিশিনাথ ছিলেন এমন একজন আধ্যাতিক সাধক, যে কোন সমস্যা বা অসুখ হলে ভক্তরা তার নামে পূজা দিলে সেরে যেত এবং মন বাসনা পূরণ হত।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে আসা সঞ্জয় মিত্র বলেন, আমি নড়াইলের নিশিনাথ তলার মেলার অনেক নাম শুনেছি তাই এবছর দেখার জন্য আসছি। নিশিনাথ তলার মেলা অনেক পুরাতন দেখে অনেক ভালো লাগল।
তিনি আরও বলেন, আমিও আমার মনের বাসনা পূরণের জন্য ইট বেঁধে রেখে গেলাম, বাসনা পূরণ হলে আবারও আসব এসে খুলে রেখে পূজা করে যাব।
নিশিনাথতলা মন্দির কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট অচীন চক্রবর্তী, আমাদের নড়াইল জেলা প্রতিনিধি উজ্জ্বল রায়কে জানান, বাপ-দাদার আমল থেকে দেখে আসছি বিশাল এলাকা জুড়ে মেলা বসত। প্রতিবছর বৈশাখ মাসে এখানে বসে নিশিনাথতলার মেলা। কত বছর পূর্বে থেকে এখানে পূজা-অর্চনা চলে আসছে তার সঠিক বলা সম্ভব নয়। প্রায় দু’শ বছর পূর্বে থেকে চলে আসছে বলে ধারনা।
তিনি কে আরও বলেন, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানসহ ৬৪ প্রহরব্যাপী মহানামযজ্ঞানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। দেশ-বিদেশ থেকে হাজারো ভক্ত পূজা-অর্চনা দিতে আসেন বাবা নিশিনাথের চরণতলায়। কেউ চিত্রানদী থেকে পানি এনে ঢালছে, কেউ ইট বেঁধে রাখছেন, কেউবা তৈল কেউবা আবার সিঁদুর লাগাচ্ছেন পাইকড় গাছটিতে। নারী, শিশু, বৃদ্ধা, ছেলে, বুড়ো সব বয়সের মানুষই এসব কাজ করছে। তাদের ধারনা এ গাছটিতে মানত করে পূজা দিলে তাদের মন বাসনা পূরণ হবে।