তদন্তাধীন ৩২ মামলায় ৮৩ ‘জঙ্গি’র জামিন

14

ভেতরে জঙ্গি আছে—এমন সন্দেহে গত বছরের ২১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর উত্তর বাড্ডার সাঁতারকুলের একটি বাড়ি ঘেরাও করে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল। অভিযানকালে ওই বাড়ি থেকে শাহীন আলম ওরফে কামাল ও মো. শাহ আলম ওরফে সালাউদ্দিন নামের দুজনকে আটক করা হয়।

আটকের পর পর বাড়ির ভেতর থেকে ওই দুজনের সহযোগীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি করতে থাকে। এতে পুলিশের কয়েকজন সদস্য জখম হন। এ ঘটনায় ডিবি পুলিশের এসআই মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম বাদী হয়ে বাড্ডা থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা করেন।

এজাহারে বলা হয়, নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সদস্যরা ওই বাড়িতে আগ্নেয়াস্ত্রসহ অবস্থান করছিল। তারা ব্লগার ও লেখকদের হত্যা এবং সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছিল।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্য মতে পরে পুলিশ সৈয়দ মো. মোজাহিদুল ইসলাম, এ কে এম মোহাইমিনুল ইসলাম, আমিনুল ইসলাম সোলাইমানী ও মেহেদী হাসান ওমি ওরফে রাফিকে আটক করে। বাড্ডা থানার ওই মামলায় পরে তাদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়। আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সদস্য সন্দেহে গ্রেপ্তার এ চারজন যথাক্রমে গত ১৭ মে, ৪ জুন, ৭ জুন ও ১৪ জুন হাইকোর্ট থেকে জামিন পেয়েছে।

শুধু এ মামলায়ই নয়, খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত দুই বছরে ঢাকা মহানগর এলাকায় বিভিন্ন থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে করা ৩২টি মামলায় ৮৩ জন আসামিকে জামিন দিয়েছেন হাইকোর্ট।

সব মামলাই তদন্তাধীন। ঢাকার বাইরেও বিভিন্ন এলাকা থেকে গ্রেপ্তার সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলার আসামিদেরও জামিন দেওয়া হয়েছে। আসামিদের বিরুদ্ধে জঙ্গি তৎপরতা চালানো, সরকার উত্খাতসহ বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে। জামিন পাওয়া আসামিদের মধ্যে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদ বাংলাদেশ (হুজি), আনসার আল ইসলাম (সাবেক আনসারুল্লাহ বাংলা টিম), নব্য জেএমবি, পুরনো জেএমবি ও হিযবুত তাহ্রীর সদস্যরাও রয়েছে।

গত ১ মার্চ শাহবাগে বারডেম হাসপাতালের সামনে থেকে সাজিদ বিন আলম নামের এক যুবককে আটক করে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম বিভাগের সদস্যরা। সাজিদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। এ সময় তাঁর কাছে থাকা ব্যাগের মধ্য থেকে হিযবুত তাহ্রীর কার্যক্রম সম্পর্কিত ভিডিও ক্লিপ, খেলাফত প্রতিষ্ঠার বিভিন্ন লেখাসংবলিত ফটোকপি জব্দ করা হয়। সাজিদ পুলিশকে জানান, তাঁর সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের ছাত্র চয়ন, মোসলেহ উদ্দিন রায়হান ওরফে রুদ্র, আবদুর রহিম, মাসুম তোফায়েল, সোমাল ওরফে সিজার, সজীব, আশরাফুল মাখলুকাত ওরফে আরমানসহ অন্য সদস্যরা হিযবুত তাহ্রীরের পক্ষে ওই দিন প্রচার চালাচ্ছিলেন।

এ ঘটনায় সাজিদসহ তাঁর সঙ্গীদের বিরুদ্ধে ২০০৯ সালের সন্ত্রাসবিরোধী আইনে (সংশোধিত ২০১৩) রাজধানীর রমনা মডেল থানায় মামলা হয়। সাজিদকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়। পরে রায়হানকেও গ্রেপ্তার করা হয়। মামলাটি এখনো তদন্তাধীন। এ অবস্থায় গত ৬ আগস্ট সাজিদকে এবং ২২ আগস্ট রায়হান হাইকোর্ট থেকে জামিন পেয়েছেন।

ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯৮ ধারায় সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ ও দায়রা আদালতকে যেকোনো মামলায় যেকোনো ব্যক্তিকে জামিন মঞ্জুর করার ক্ষমতা দেওয়া আছে। বাংলাদেশ ল ডাইজেস্ট ১৫-তে উল্লেখ করা হয়েছে, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের এক রায়ে বলা হয়েছে, জামিন অযোগ্য অপরাধের ক্ষেত্রে জামিন দেওয়ার জন্য হাইকোর্ট বিভাগকে বর্ধিত ও ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। তবে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার স্বাভাবিক রীতি যাতে বিঘ্নিত না হয় সে জন্য এই ক্ষমতা ব্যতিক্রমী ক্ষেত্র ব্যতীত যৌক্তিক ও বিচারিকভাবে প্রয়োগ করতে হবে।

বাংলাদেশে জঙ্গিদের কর্মকাণ্ডের ভয়াবহতা বাড়ার মধ্যেই জঙ্গি সন্দেহে গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা এভাবে জামিন পাওয়ায় সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এতে জঙ্গিরা আরো উৎসাহিত হচ্ছে। কারণ জঙ্গিরা জামিন পেলে আবারও তারা জঙ্গি কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের পুলিশের উপকমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ মহিবুল্লা খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অপরাধীদের ধরা আমাদের কাজ। আমরা তাদের আদালতে পাঠাই। জামিনের এখতিয়ার আদালতের। আদালত বিভিন্ন বিবেচনায় জামিন দেন। তবে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় তদন্তাধীন অবস্থায় জামিন পেলে আবার তারা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। অতীতের রেকর্ড তা-ই বলে। জঙ্গিরা জামিন পেলে আবারও তারা জঙ্গিবাদে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে। এতে দেশেরই ক্ষতি হয়। ’

ডিসি মহিবুল ইসলাম আরো বলেন, ‘নিরপরাধ মানুষকে আমরা কখনো জঙ্গি বা সন্ত্রাসবিরোধী আইনে আটক করি না। যখন যাকে আটক করা হয় তার যতটুকু সম্পৃক্ততা থাকে ততটুকুই মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়। এ ক্ষেত্রে আমাদের কোনো ত্রুটি হয় না। তদন্তের পরে অপরাধীর অপরাধে সম্পৃক্ততার বিস্তারিত উঠে আসে। এজাহার হলো মামলার ভিত্তি। সেখানে বিস্তারিত থাকে না, তদন্তেই বিস্তারিত থাকে। তাই চাঞ্চল্যকর ও গুরুতর অভিযোগের মামলাগুলো ভিন্ন চোখেই দেখা হয়। ’

জানা যায়, গত ৭ মে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের সদস্যরা মতিঝিলের পীরজঙ্গি মাজারের পাশ থেকে গ্রেপ্তার করে এ বি এম সোহেল উদ দৌলা সোহেল, আহাদুল ইসলাম সাগর, জগলুল হক মিঠু, তোয়াসিন রহমান, সাব্বির আহমেদ ও হাসান ওরফে রেজাকে। তাদের কাছ থেকে জিহাদি মতাদর্শের বিভিন্ন বইসহ জঙ্গি কার্যক্রমে ব্যবহূত বিভিন্ন সরঞ্জাম জব্দ করা হয়। পরে তাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা হয়। এজাহারে উল্লেখ করা হয়, আসামিরা গ্রেপ্তারের পর স্বীকার করে যে তারা নিষিদ্ধ ঘোষিত আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সদস্য। তারা সরকার উত্খাত, ব্লগার ও লেখকদের হত্যার পরিকল্পনা করে সেই লক্ষ্যে কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছিল।

তবে গত ২৫, ৩, ২০, ২২ ও ২৪ জুলাই ভিন্ন ভিন্ন আদেশে আসামি সোহেল, সাগর, মিঠু, তোয়াসিন ও সাব্বির হাইকোর্ট থেকে জামিন পেয়েছে।

নব্য জেএমবির ‘সারোয়ার-তামিম’ গ্রুপের সদস্য মো. জাহিদুল হক ওরফে জিহান ও ফাতেমা আক্তার রুমাকে (গাজীপুরে জঙ্গি অভিযানে নিহত জঙ্গি অপুর স্ত্রী) র‌্যাব গ্রেপ্তার করে গত ১৩ এপ্রিল রাতে। রাজধানীর উত্তরা পশ্চিম থানার ১১ নম্বর সেক্টরের একটি বাড়ি থেকে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের কাছ থেকে বিভিন্ন উগ্রবাদী মতাদর্শের বই জব্দ করা হয়। তাঁদের মোবাইল ফোন জব্দের পর দেখা যায়, ওই ফোন ব্যবহার করে জঙ্গিসংক্রান্ত তথ্য লেনদেন হয়েছে। র‌্যাবের উপপরিচালক মো. জহির উদ্দিন বাবর বাদী হয়ে উত্তরা পশ্চিম থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা করেন।

জাহিদুল জামিন পেয়েছেন গত ৮ আগস্ট, ফাতেমা জামিন পেয়েছেন ৯ সেপ্টেম্বর। ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের তদন্তাধীন মামলাগুলোর খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত দুই বছরে ৩২টি মামলায় ৮৩ জন আসামি হাইকোর্ট থেকে জামিন পেয়েছে। সারা দেশের গ্রেপ্তার জঙ্গিরাও বিভিন্ন সময় উচ্চ আদালত থেকে জামিন পেয়েছে।

সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র জানায়, এ বছর জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় ১১৪ জন আসামি জামিন পেয়েছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, সন্ত্রাসবিরোধী আইনে করা মামলার মধ্যে তদন্তাধীন ৩২টিতে ৮৩ জন জামিন পেয়েছে হাইকোর্ট থেকে। তাদের মধ্যে ৪৪ জন জামিন পেয়েছে একটি বেঞ্চ থেকে। অন্যরা পৃথক পৃথক আদেশে বিভিন্ন আদালত থেকে জামিন পায়।

ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট মোতাহার হোসেন সাজু বলেন, যে মুহূর্তে সরকারি নীতি হচ্ছে দেশ থেকে জঙ্গি নির্মূল করা, সেই মুহূর্তে একের পর এক জামিন পাচ্ছে জঙ্গিরা। এতে জঙ্গিরা উৎসাহিত হচ্ছে। বিশেষ করে তদন্তাধীন মামলায় কেউ বলতে পারবে না যে আটক ব্যক্তিরা জঙ্গি নয়। তদন্ত শেষ হওয়ার পর যদি প্রমাণিত হয় যে আটক ব্যক্তি জঙ্গি নয়, তবে তাকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। জঙ্গি সন্দেহে ঢাকার কয়েকজন বাড়ির মালিক গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। জঙ্গি সংশ্লিষ্টতা না পেয়ে তাঁদের মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সুনির্দিষ্ট অভিযোগে যাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে তাদের জামিনে মুক্তি দেওয়া হলে তদন্তে ব্যাঘাত ঘটে। সরকার যখন জঙ্গিদের প্রতি ‘জিরো টলারেন্স’ দেখাচ্ছে, তখন এই জামিন জঙ্গি নির্মূল কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করবে। জঙ্গিদের নিয়ে নতুন করে ঝুঁকির মধ্যেও পড়তে হচ্ছে সরকারকে।

 

kalerkantho