কুলাউড়া থানার ওসি ইয়ারদৌস হাসান যা পারেন তা হয়তো অনেকেই পারেন না। পারলে পাল্টে যেত বাংলাদেশ পুলিশের ভাবমূর্তি

44

এইচ. এম. আহসান বিপ্লব : সোমবার ২২ এপ্রিল আনুমানিক বিকাল ৪:৩০ মিনিটের দিকে আমার ব্যবহারিত মোবাইলটি নিয়ে বসেছি সোস্যাল যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে। পুলিশ জনতা, জনতাই পুলিশ নামক পেজে “মাসুদ গোফরান” এর (একটি হত্যা মামলা ও ওসির মানবিকতা) নামক এক পোষ্টে দৃষ্টি আটকিয়ে গেল। কৌতুহলি মনে পোষ্টটি পড়লাম এবং পড়া শেষ হওয়া মাত্রই গুগলে সার্চ দিলাম কুলাউড়া থানার নামে। সেখান থেকেই থানার ওসি সাহেবের সরকারি নাম্বারটি সংগ্রহ করে ফোন দিলাম। প্রথমে আমার কলটি রিসিভ না হলেও এক মিনিটের ব্যবধানে ওসি সাহেবের নাম্বার থেকে কল ব্যাক আসে। কথা হল উক্ত পোষ্টটির সত্যতার বিষয়ে (যেহেতু বর্তমনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকে ভিত্তিহিন খবর, সংবাদ, ঘটনা ইত্যাদি ইত্যাদি প্রকাশ করে থাকে)। কথা শেষে আমি ব্যক্তিগতভাবে ওসি স্যারকে ধন্যবাদ জানালাম এবং এই বিষয়ে লেখার অনুমতি চাইলাম।

কুলাউড়া উপজেলা বাংলাদেশের মৌলভীবাজার জেলার একটি প্রশাসনিক এলাকা। ১৯৮২ সালে কুলাউড়া উপজেলায় উন্নীত হয়। বর্তমানে এটি একটি পৌরসভা। যেখানে যাওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়নি। তবে সোস্যাল যোগাযোগের একটি পোষ্টের মাধ্যমে সৌভাগ্য হল এই থানার একজন মহৎ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সাথে ফোনে কথা বলার।

আসছি মূল ঘটনায় : কুলাউড়া থানার গুতগুতি গ্রামের মোঃ দিলু মিয়া(৩২), বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান। অপরদিকে তার চাচাত ভাইয়েরা সংখ্যাধিক হওয়ায় পারিবারিক সম্পতি ভোগ করতো বেশি। জমির ভাগ বাটোয়ারা নিয়ে তাদের মধ্যে বিরোধ অনেক দিনের। এ নিয়ে কোন প্রতিবাদ করলে দিলু মিয়াকে করা হয় চরম অপমান অপদস্থ।  গত ১৭ এপ্রিল দুপুরে জমির ভোগ দখল নিয়ে দুই পরিবারের মধ্যে শুরু হয় কলহ। এরপর ধারালো অস্ত্র ও লাঠি দিয়ে আঘাত করে ঘটনাস্থলেই খুন করা হয় দিলু মিয়াকে। খবর পেয়ে ফোর্স নিয়ে ছুটে আসেন এই দিনেই কুলাউড়া থানায় যোগদান করা থানার অফিসার ইনচার্জ জনাব ইয়ারদৌস হাসান। এসে দেখেন জ্ঞানহীন অবস্থায় পড়ে আছে নিহত দিলুর মা, দিলুর শিশু সন্তান মিশাত ও নিশি বারবার মুর্ছা যাচ্ছে তাদের বাবাকে হারিয়ে, দিলুর স্ত্রী সেই যে জ্ঞান হারিয়েছেন এখনো জ্ঞান ফিরেনি। এই ঘটনায় বাকরুদ্ধ এলাকার মানুষ। থানার অফিসার ইনচার্জ জনাব ইয়ারদৌস হাসান ধুলাবালিতে গড়াগড়ি করা দিলুর শিশু সন্তানদের কোলে তুলে নিলেন ও বুকে টেনে নিলেন। একমাত্র ছেলে দিলুকে হারিয়ে পাগলপ্রায় মাকে শান্তনা দিলেন। জনাব ইয়ারদৌস হাসান নিজেকেই নিহত দিলুর স্থানে স্থাপন করে দিলুর মাকে বললেন, এখন থেকে তিনিই তার সন্তান! শিশু সন্তানদের দেখভালের দায়িত্ব নিয়ে শান্তনা দিলেন দিলুর স্ত্রীকেও। একজন পুলিশ অফিসারের এমন মমতা দেখে উপস্থিত সবাই হতবাক। দিলুর লাশ সামনে রেখে এক অন্যরকম পরিবেশের সৃষ্টি করলেন সদ্য যোগদানকৃত ওসি জনাব ইয়ারদৌস হাসান । ঘটনাস্থালেই দ্রুত দিলুর হত্যাকারীদের গ্রেফতারকরে বিচারের আওতায় আনার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন।

আজ ২২ এপ্রিল সোমবার গত কাল ছিল ২১ এপ্রিল ছিল পবিত্র শব-ই বরাত। দিন তারিখ এই কারণেই বলছি অনেকে প্রতিশ্রুতি দিতে আগে থাকলেও তা পালনে পিছিয়ে থাকে অনেক দূরে। কিন্তু এই ক্ষেত্রে ইতিহাস তৈরী করলেন জনাব ইয়ারদৌস হাসান। যা বাংলাদেশ পুলিশবাহিনীর জন্য অত্যন্তত গর্ভের, অনুকরনীয়, অনুসরনীয়। যদি অন্যান্য পুলিশ বা পুলিশ কর্মকর্তারা তাঁদের বিবেক মানবতাবোধ বিসর্জন না দিয়ে থাকেন। 

গতকাল শবে বরাত উপলক্ষে সেমাই, চিনি, দুধ, বিস্কুট, কেক, চকলেট ও নগদ অর্থ ওসি জনাব ইয়ারদৌস হাসান নিজে গিয়ে দিলুর পরিবারকে পৌঁছে দিয়েছেন কুড়াউড়া থানার পক্ষ থেকে। আর ইতিমধ্যেই হত্যা মামলায় সাত জন এজাহার নামীয় আসামিদের মধ্যে ছয় জনকে গ্রেফতার করে বিজ্ঞ আদালতে সোপর্দ করেছেন। তাদেরকে পুলিশ রিমান্ডের আবেদন শুনানীর অপেক্ষায় মূলতবী আছে।

অসহায় দিলুর পরিবারের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশে ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে ফলাও করে প্রকাশিত হওয়ায় ওসি ইয়ারদৌস হাসান মৃত দিলুর শিশু সন্তানদের জড়িয়ে ধরা ছবি এখন সর্বত্র ভাইরাল। মাত্র এক মাসের কর্মকাণ্ডে কুলাউড়ার আপামর মানুষের হৃদয়ে ভালবাসার স্থান করে অনন্য নজির স্থাপন করেছেন ওসি জনাব ইয়ারদৌস হাসান । এমন পুলিশী কার্যক্রম অব্যহত থাকুক, জনমনে পুলিশের প্রতি আস্থা বাড়ুক এ প্রত্যাশা কুলাউড়াবাসীর হলেও এমন ভূমিকা প্রয়োজন পুরোদেশের পুলিশবাহিনীর। পুলিশের এই ভূমিকায় প্রত্যাশা করে দেশের সকলস্তরের মানুষ। এমন প্রশংসনীয় সব কর্মকান্ডেই পাল্টে যাবেই দেশের পুলিশবাহিনীর ভাবমূর্তি । কতিপয় অসাধু কর্মকর্তার অপকর্মের দায়ে আজ দেশের পুলিশবাহিনী জনসাধারণের মনে প্রশ্নবিদ্ধ। সেই যায়গাথেকে কুলাউড়া থানার ওসি জনাব ইয়ারদৌস হাসান এক অনন্য নজির স্থাপন করেছেন। দেশের প্রতিটি থানাতে একজন ইয়ারদৌস হাসানের মত মানসিকতা সম্পন্ন কর্মকর্তা থাকলে পাল্টে যাবেই পুলিশের প্রতি সাধারণ জনগণের ধারনা, ফিরে আসবে পুলিশের প্রতি আস্থা ও ভালোবাসা।